রুবানা হক, করোনা পরবর্তী বিশ্ব ও নয়া সাম্রাজ্যবাদ
জিন্নাতুন নেছা
পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ-এর সভাপতি রুবানা হক এক ভার্চুয়াল মিটিংয়ে জানিয়েছেন, এ মাস থেকেই শ্রমিক ছাঁটাই শুরু হবে। বিষয়টিকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতা’ উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, এ জন্য গার্মেন্টস মালিকদের কিছুই করার নেই! কারণ করোনার কারণে বর্তমানে প্রায় ৫৫ শতাংশ হারে চলছে পোশাক শিল্পের উৎপাদন। অনেক কারখানা এখন বন্ধ। উল্লেখ্য যে, সেই ভার্চুয়াল মিটিংয়ে সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের অনেকেই ছিলেন।
অবশ্য যারাই সরকারি নীতি নির্ধারক, তারাই গার্মেন্টস মালিক! যদিও গত এপ্রিল মাসে সরকার পোশাক শ্রমিকদের বেতন বাবদ ৫০০০ কোটি টাকা প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল। সেখানে শর্তই ছিলো যে, প্রণোদনার টাকা শুধু শ্রমিকদের বেতনের পেছনেই ব্যয় করতে হবে। রুবানা হকের এই ঘোষণার পর স্বাভাবিকভাবেই কয়েকটি প্রশ্ন সঙ্গত কারণে সামনে চলে আসে। প্রথম প্রশ্ন- প্রণোদনার টাকা দিয়ে কি গার্মেন্টস মালিকগণ নিজেদের পকেট ভরেছেন? দুই, নাকি সরকার শুধু ঘোষণা দিয়েছেন? এখনও কোনো প্রণোদনা দেওয়া হয়নি? এক্ষেত্রে দ্বিতীয় প্রশ্নটি যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে বলবো- সর্ষের মধ্যেই ভূত! আর প্রথম প্রশ্নটি যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে- তেলে জলে মিশে সব একাকার!
বাংলাদেশের অন্যতম একটা সেক্টর হলো গার্মেন্টস। এখান থেকে বাংলাদেশ সরকার রেমিট্যান্স পায় দ্বিতীয় বৃহত্তম। আর বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের এই দেশে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করে পোশাকশিল্পে (বিজিএমইএ-এর তথ্যানুযায়ী)। যদিও বাংলাদেশ শ্রম মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী এই সংখ্যা ২১ লাখের কিছু বেশি। এর মধ্যে নারী শ্রমিক প্রায় ৮০ ভাগ।
দেশের, সরকারের এই অন্যতম খাত টিকিয়ে রেখেছে এই শ্রমিকরা। কিন্তু তারা তার বিপরীতে বেতন পেয়েছে নামমাত্র। কারণে-অকারণে মাইনে কাটা, মাসের পর মাস বেতন বকেয়া এই সেক্টরে নতুন নয়। তুচ্ছ কারণে ছাঁটাইয়ের ঘটনাও ঘটে। মোটা দাগে অনেক কষ্ট করেই এই সেক্টরে চাকরি বাঁচিয়ে চলতে হয়। এই হলো গার্মেন্টস সেক্টরের চিরাচরিত চিত্র। কোনো ধরনের নিয়মনীতির তোয়াক্কা গার্মেন্টস মালিকরা কোনো দিনও করেননি। এমনকি রানা প্লাজায় আহত-নিহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণও ঠিকমত দেওয়া হয়নি। এর সমীকরণ খুবই সহজ- পুঁজিবাদী শোষণ, অধিকতর মুনাফা ও উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্ব।
বর্তমানে কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতেও গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিয়ে নানান নাটক হতে দেখেছি। একবার তাদের বাড়ি পাঠানো হয়েছে আবার ফিরিয়েও আনা হয়েছে নানা দুর্ভোগে। সম্প্রতি আমরা অনেক শ্রমিককে হেঁটে হেঁটেই বাড়ি ফিরতে দেখেছি। এ দৃশ্য দেশবাসী ভুলবে কী করে? এ সময় কোনো ধরনের শারীরিক দূরত্ব, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কোনো কিছুরই বালাই ছিলো না।
এ জন্যই হয়তো রুবানা হক মন্তব্য করেছেন- গরিবের করোনা কম হয়! কী হাস্যকর! তাহলে রুবানা আপা আপনি গরিব হয়ে যান। কিংবা যেসব উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার করোনা হচ্ছে তাদের গরিব হতে বলুন। সম্পদ, ক্ষমতার লোভ তাদের ত্যাগ করতে বলুন। জীবন বাঁচানোর চেয়ে এই কাজ নিশ্চয়ই খুব কঠিন কিছু নয়। অথচ প্রায় অসম্ভব! এসি রুমে বসে এ ধরনের কথা বলা সহজ। কিন্তু বাস্তবতা ঠিক উল্টো!
মনীষী মার্ক্স বলেই গেছেন, সেই বহু যুগ আগে, শ্রমিকের রক্ত শোষণ করেই মালিকরা অধিকতর মুনাফা অর্জন করেন। লাখো শ্রমিকের রক্ত পানি করা শ্রমেই গার্মেন্টস শিল্প আজ দেশের দ্বিতীয় বৈদেশিক মূদ্রা উপার্জনকারী খাত। আনিসুল হকের স্ত্রী হিসেবে একজন নারী বিজিএমইএ-র সভাপতি হওয়া এবং আপনার মনোমুগ্ধকর ভাষণ শুনে স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা করেছিলাম গার্মেন্টস শিল্প কিছুটা হলেও নারীবান্ধব হবে এবং মানবিক হবে। কিন্ত আপনিও যে পুঁজিবাদ এবং পুরুষতন্ত্রের দুষ্টচক্রের বাইরে বেরুতে পারেননি তা এখন স্পষ্ট।
যেখানে বিশ্ব কোভিড-১৯ এর মতো মহামারিতে আক্রান্ত, সেখানে সরকার তার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার পরও কেন রুবানা হক তথা গার্মেন্টস মালিকদের এমন ঘোষণা! আর সেই ঘোষণার সময় সরকার মহলের নীতি নির্ধারকেরা কেন নিরুত্তাপ, নিশ্চুপ? তবে কি সমীকরণ সেই আগের মতোই- স্বার্থের প্রশ্নে বাঘে মহিষে এক ঘাটেই জল খাচ্ছে? মাঝখান থেকে শোষিত হচ্ছে স্বল্প বেতনে অমানবিক পরিবেশে চাকরি করা দরিদ্র গার্মেন্টস শ্রমিক।
তাহলে কি করোনা আমাদের মানবিক করতে ব্যর্থ হয়েছে? আমরা করোনা পরবর্তী মানবিক যে বিশ্ব ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখছি পুঁজিবাদের কাছে কি সেই স্বপ্ন মার খাবে? বিশ্ব ব্যবস্থা কি আরো মুনাফা ও লুটেরা অর্থনীতিকেন্দ্রীক নয়া সাম্রাজ্যবাদের পথেই হাঁটছে?
লেখক: উন্নয়ন কর্মী
Collected : 


No comments
Welcome to join our family. Apparel Merchandiser Club of Bangladesh Ltd. Est. On : 04-09-2009 Year 11 Govt. REG No:C 101387 । সদস্য হউন –MEMBERSHIP OPEN FOR ALL .আগ্রহীরা Kindly fill-up below Membership Form http://bit.ly/2DqMC3p